তরুণ মজুমদার ও তাঁর দাদার কীর্তিতে বাঙালীর প্রভাব!

তরুণ মজুমদার ও দাদার কীর্তি

১৯৮০ সালের জুলাই মাসের শেষ! শোকস্তব্ধ বাঙালী! অভিভাবক হীন বাংলা চলচিত্র যেন মহানায়কের অকাল প্রয়নে মাথায় হাত দিয়ে বসেছিলেন পরিচালক, প্রয়োজকরা; অতুল শুন্যতা! কাদের নিয়ে বানানো হবে সিনেমা? তেমন গল্প কোথায় পাবেন? উত্তম কুমার তো নিজেই চলে যেতেন সাহিত্যিকদের কাছে, চেয়ে নিতেন গল্প! এখন কি হবে তাহলে? এরকম একটা পরিস্থিতির মধ্যে ওই বছরই অল্প বয়সী এক ঝাক ছেলে মেয়ে নিয়ে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি অপ্রকাশিত গল্পের ওপর তৈরি হওয়া সিনেমা হইচই ফেলে দিলো সিনেমা মহলে আর সেই সিনেমাকে নিয়ে লেখা হয়ে গেলো বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়  

সত্যজিৎ রায় বলতেন বুদ্ধিদীপ্ত পরিচালক। ৮০-৯০ দশকের আম-জনতার সেন্টিমেন্ট এত নিটোল ভাবে এত সারল্যর সংগে তরুণ মজুমদার ছাড়া আর কেই বা ফুটিয়ে তুলতে পারে। নিজের সিনেমা প্রসংগে তরুণ বাবু বলেন - "আমি বরাবরই ভীষন আটপৌড়ে জীবন পছন্দ করি, আমার কাছে প্রেমটাও খুব আটপৌড়ে। সেই প্রেম যে যত ঢেকে রাখে তত তাঁর সৌন্দর্য" 

সেই তরুণ মজুমদার যিনি বক্স অফিস কে উপেক্ষা না করেও রুচি সম্মত সিনেমা উপহার দিয়ে গেছেন দর্শকদের। বিনোদনের প্রোয়োজনে রুচি ও শিল্পবোধের সংগে কোন রকম আপোস করেন নি তিনি। চাওয়া পাওয়া সিনেমা দিয়ে যে পরিচালকের শুরু সেই পরিচালক রোম্যান্টিক গল্প বুনতে যে দক্ষ তা বলাই বাহুল্য। তাঁর চোখ যেন জহুরির চোখ! বালিকা বধূ সিনেমাতে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায়শ্রীমান পৃথ্বীরাজে মহুয়া রায়চৌধুরী আর এই দাদার কীর্তিতে তাপস পাল ও দেবশ্রী রায় এরা পরবর্তীতে বাংলা সিনেমার প্রথম শ্রেনীর নায়ক-নায়িকা হয়েছেন। এরা সবাই তরুণ মজুমদারের আবিস্কার। দাদার কীর্তির এই দাদা টি ছিলেন নবাগত তাপস পাল। অভিনয় করেছিলেন কেদারের চরিত্রে 

রবীন্দ্র নৃত্যনাট্য পাড়ার অনুষ্ঠানে একটা সময়ে বাঁধা ধরা ছিলো আর তাই চিত্রাঙ্গদা আর শ্যামা শাপ মোচনের অশ্রুমোচন অব্যর্থভাবে শুধু আমাদেরই জন্য। পাড়ার অনুষ্ঠানে রিহার্সালে পাড়ার দাদা দিদিদের প্রেম, বন্ধু-বান্ধবদের পেছনে লাগা আর সব বয়সের পাড়ার মানুষের অংশগ্রহন এ সব কিছুর আনন্দঘন নির্ঝাস প্রতিটি ফ্রেমে ছড়িয়ে দিয়েছেন তরুণ মজুমদার তাঁর সিনেমাতে। 

সিনেমার বাহিরে শুটিং পরিবেশে ছিলো তেমন ই মজাদার পরিবেশ। দাদার কীর্তি ইউনিটে সব'চে কম বয়সী ছিলেন দেবশ্রী রায় আর এই সিনেমা থেকে চুমকী বদলে দেবশ্রী নাম রেখে দিয়েছেন তরুণ বাবু যেমন টা শিপ্রা কিংবা সোনালি নাম রেখে দিয়ে নাম দিয়েছিলেন মহুয়া রায়চৌধুরীর। এর আগে তাঁর কুহেলি সিনেমাতেও রানু চরিত্রে দেবশ্রী রায় কে দেখা গিয়েছিলো। এজন্য তরুণ বাবুর ইউনিটে সবাই দেবশ্রী কে স্নেহ করতেন। শুটিং এর বাহিরে শিমুল তলার সেই বিশাল বাড়িতে অনুপ কুমারকালী বন্দ্যোপাধ্যায় এরা দেবশ্রী কে ভুতের ভয় দেখাতেন। এক সাথে খাওয়া-দাওয়া, আড্ডা, গল্প আর এজন্যই হয়তো ক্যামেরার সামনেও এত প্রাণবন্ত, এত সাবলিল থেকেছেন প্রতিটি শিল্পীরা। দাদার কীর্তির গল্প, গান, অভিনয় সবটা নিয়ে সিনেমাটি আজো যে কারো মন ভরিয়ে দেয়

ছন্দবানী ক্লাবের লিডার ভোম্বল চরিত্রটি সিনেমা চলাকালীন সময়ে যে কারোই ভালো লাগবে। তাঁর একটা বিশেষ গুন আছে; ছন্দ মিলিয়ে কথা বলা এর জন্যই মুলত ক্লাবের নাম ছন্দবানী। ভোম্বল চরিত্রে অনুপ কুমার প্রথম দিন থেকেই বোকা কেদারের পেছনে লেগে পড়ে। কেদারের সারল্যের সুযোগ নিয়ে সরস্বতীর সামনে তাকে রীতিমত অপদস্ত করা থেকে শীতে নদীতে ঠান্ডা জলে ডুবিয়ে জ্বর আনানো এবং নানা রকম দুষ্ট বুদ্ধির নেতা ছিলেন এই ভোম্বল ওরফে অনুপ কুমার

কেদারতো ভোম্বল'দা কে আপন ভেবে নিয়েছিলো পরে যখন কেদারের কাছে সব পরিষ্কার হলো তখন ও কেদার কোন রকম রাগ না করে বরং ভোম্বল'দা কে ধন্যবাদ দিলেন এই জন্যে যে তিনি কেদারের চোখ খুলে দিয়েছেন। এরপরেই একটি অনুষ্ঠানে ষ্টেজে উঠে গাইতে হলো কেদার কে। সেই গান শুনে দর্শকাসনে বসে থাকা সরস্বতী কাঁদতে কাঁদতে উঠে চলে যায় এবং এই দৃশ্য চোখে পড়ে যায় কেদারের বৌদির অর্থাৎ সন্ধ্যা রায়ের। কেদারের প্রতি সরস্বতীর অনুরাগ এভাবেই প্রকাশিত হয়ে পড়লো আর রবীন্দ্রনাথের সেই গানের মধ্য দিয়ে চিরাচরিত ভাবে প্রকাশ পেলো ঈশ্বরের কাছে আত্ন নিবেদনের প্রশান্তি। গানটি ছিলো - এই করেছো ভালো নিঠুর ও হে

তরুণ বাবুর সিনেমাতে রবীন্দ্রনাথের গান যেন আস্ত একটা চরিত্র হয়ে ওঠে। দাদার কীর্তি সিনেমাতেও একই ব্যাপার। এই সিনেমাতে রবীন্দ্রনাথের একটি গানকে দুবার ব্যাবহার করা হয়েছে। একদম শুরুর দিকে যখন সরস্বতীদের বাড়িতে যখন কেদার গেলো তখন তাপস পালের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে এবং সিনেমার শেষের দিকে কেদারের প্রতি বিরূপ মন্তব্য করার যন্ত্রনা নিয়ে ঘরভর্তি লোকজনের সামনে, কেদারের সামনে, বাহিরে থেকে দেখতে আসা পাত্র পক্ষের সামনে মহুয়া রায়চৌধুরীর লিপে অরুন্ধতী হোম চৌধুরীর কন্ঠে চরণ ও ধরিতে দিওগো আমারে এই গানটি দাদার কীর্তি সিনেমার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে। স্ক্রিনে দেখা যায় এই গানটি গাওয়ার পরে সরস্বতী পিয়ানোর উপরে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। শোনা যায়, এই দৃশ্যর পরেও নাকি মহুয়া কাঁদতে থাকেন এবং পরে তরুণ মজুমদার গিয়ে যখন মহুয়াকে তুলে ধরেন তখনো তাকে জড়িয়ে কেঁদেই যাচ্ছিলেন মহুয়া


🔊 আমার মতামত - এই করেছো ভালো নিঠুর ও হে এখনো এই গান যদি ভেসে ওঠে মন কেমন নস্টালজিয়া হয়ে ওঠে। সেই সহজ সরল বিএ ফেল কেদারের কথা মনে আসে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের এমন অকল্পনীয় গল্পকে তরুণ মজুমদার এত সুন্দর করে তুলে ধরেছেন যা আজও কুর্নিশ যোগ্য। এই সিনেমাতে পাড়ার ছেলেদের দুর্গা পুজোর আনন্দের সিনগুলি আজও পুরনো স্মৃতি উস্কে দেয়

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Please validate the Captcha

নবীনতর পূর্বতন

যোগাযোগ ফর্ম